Wednesday, July 6, 2016

গুরাবা সমাজের সাথে মানিয়ে চলা ....

সমাজের সাথে মানিয়ে চলা ......
(গুরাবা)
.
জাহেলিয়্যাত এবং পাপ পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত একটা সমাজে কোন মানুষ যখন বুঝতে পারে তার একদিন মরতে হবে, বিচারের মাঠে প্রত্যেকটা বাজে কথা, কুদৃষ্টি আর গীবতের জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে - তখন সে আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হতে থাকে।
.

তার আচার আচরনে পরিবর্তন আসে, সে বন্ধুদের সাথে সব আলোচনায় বসতে পারে না, কাজিনদের সাথে সব পার্টিতে অ্যাটেন্ড করতে পারে না। তাই বলে সে পারফেক্ট না, তার ভুল আছে, সীমাবদ্ধতা আছে।
.
কিন্তু তখন সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। তারা সাহায্য তো দূরে থাক, বরং নানা ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে তাকে বাঁধা দেয়।
.
ছেলে দাঁড়ি রাখতে চাইলে তখন তাকে বলা হয় - দাঁড়িই কি সব? আরো তো কত খারাপ কাজ করিস?
.
মেয়ে হিজাব পড়তে চাইলে বলা হয় - কেন তুই কি এখন খারাপ আছিস? আমরা কি সব নষ্ট মেয়ে? মনের পর্দাই প্রকৃত পর্দা।
.
বন্ধুদের সাথে বাজে আড্ডাতে যোগ না দিলে, লজ্জা পেলে - তাকে অতীত নিয়ে খোটা দেয়া হয়। বলা হয় - খুব হুজুর হইছো না? এই তোমরাই তলে তলে সবচেয়ে বড় শয়তান।
.
কাজিনদের সাথে আড্ডা মারা অপছন্দ করলে, গায়ে হলুদ, বিয়েতে নাচানাচি, ঢলাঢলি পছন্দ না করলে --- তাকে তখন সামাজিকতার কথা বলা হয়, মানিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়।
.
সামাজিক সবকিছুতে তাকে মানিয়ে নিতে বলা হয়। কিন্তু তার জন্য কেউ মানিয়ে নেয় না।
.
কেউ তার জন্য লাউড স্পিকারে মিউজিক শোনা বন্ধ করবে না। এটা বুঝেও যে - এটা হারাম কাজ আর ইসলাম প্রাকটিস করতে চাওয়া একটা মানুষের জন্য এটা কষ্টকর।
.
বন্ধুরা তার সামনে সিগারেট খাওয়া কিংবা ছেলেমেয়ে নিয়ে বাজে কথা বলা বন্ধ করবে না। ইচ্ছা করেই হয়তো আরো বেশি করবে।
.
সে যদি তখন রিঅ্যাক্ট করে, তখন সেটা হবে অহংকার। সে যদি তখন লজ্জাতে চুপ করে থাকে, তবে সেটা হবে দুর্বলতা।
.
এই সমাজটা ধীরে ধীরে তার কাছে বিষময় হয়ে যায়। মানুষের সাথে মুখে হাসি নিয়ে কথা বলা ছেলেটা আস্তে আস্তে অসামাজিক হয়ে যায়।
.
একটা মানসিক দ্বন্দের মাঝে বসবাস করা ছেলেটা একসময় তার পরিচয় খুঁজে পায়। তার পরিচয় সে অপরিচিত, সে ভিন্ন।
.
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
" ইসলামের শুরু হয়েছে যখন তা ছিল গারীব (আগন্তুক, অচেনা, অদ্ভুত, অপরিচিত) অবস্থায়।। এটা আবার ফিরে যাবে সে গারীব অবস্থায়। আর সুসংবাদ হচ্ছে গুরাবাদের (অচেনা, অদ্ভুত, অপরিচিতদের) জন্য।" [মুসলিম]
.
গুরাবাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মত কোন স্যাক্রিফাইস এখনও আমরা করি নাই, এখনো হয়তো যেদিকে স্রোত সেদিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি। তবুও আল্লাহর কাছে দুয়া করি আল্লাহ তা'আলা যেন - আমাদের গুরাবাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মত তাওফিক দান করেন। আর আমাদের ভুল, ত্রুটি, সীমাবদ্ধতাকে মাফ করেন।
.
‪#‎গুরাবা‬
‪#‎অসামাজিক‬
‪#‎অদ্ভুত‬

জ্ঞান

আমরা জানি যে কুরআন ও হাদিসে বিভিন্ন সময়ে ‘ইলম’ বা ‘জ্ঞান’ এর কথা বলা হয়েছে। জ্ঞানার্জন বলতে আমরা আসলে কী বুঝি? অনেক সময়ে গুরুজনরা কিছু কিছু আয়াত ও হাদিস উল্লেখ করে ছোটদেরকে বলেন— ভালো করে পড়াশুনা কর।এটা কুরআন-হাদিসে বলা আছে।

“জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে চীনদেশে যাও”—  এমন জাল হাদিসও অনেক সময়ে ব্যবহার হয়।ইসলাম আসলে কোন জ্ঞানটির প্রতি জোর দিয়েছে? কোন বিষয়ে জানবার জন্য কুরআন-হাদিসে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে?

.

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল(র) বলেছেনঃ-  “আবশ্যক হল এমন জ্ঞান অর্জন করা যার উপর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত এবং যা পরিত্যাগ করা তার[একজন মুসলিমের] জন্য  উচিত না।” তাঁকে বলা হল— “দ্বীন তো সকল জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত”। তিনি বললেনঃ- “ফরয, যেগুলো তার উপর ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক – এসব ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন ফরয হবার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।”
[আল আদাবুশ শারিয়াহ (২/৩৩-৩৪), ইবন মুকলিফ]
.
ইবন রজব হাম্বলী(র) আরো বিস্তারিত বলেছেন— “নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুসলিমের উপর দ্বীনের ঐসব ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন ফরয—যেগুলো তার প্রয়োজন।যেমনঃ পবিত্রতা, নামায, রোজা।আর যার সম্পদ আছে তার জন্য ঐ জ্ঞান অর্জন ফরয যা ঐ সম্পদের কারণে তার উপর দায়িত্ব তৈরি করে যেমনঃ যাকাত, সদকাহ, হজ এবং জিহাদ।এ  কারণে যারা বেচা-কেনা করেন, তাদের উপরে ক্রয়-বিক্রয়ে হালাল-হারাম শিক্ষা করা ফরয।”
[মাজমু আর রাসাইল, অধ্যায়” ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া, শারহু হাদিস আবি দারদা, পৃষ্ঠা ২২-২৩]
.
পূর্বযুগের এই উলামাগণের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল মানুষের জন্য কোন জ্ঞান অর্জন করা সর্বাপেক্ষা জরুরী এবং কোন কোন দিকে এই জ্ঞান অর্জন করতে হবে। দুনিয়াবী জ্ঞান অর্জন করা অবশ্যই জায়েজ, বরং প্রয়োজনের জন্য উপকারী দুনিয়াবী জ্ঞান [যেমন লেখাপড়া, বৈজ্ঞানিক গবেষণা] চর্চা করা উত্তম। তবে এর আগে অবশ্যই আমাদেরকে প্রয়োজনীয় ইসলামী জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
.
যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করার জন্য পথ অতিক্রম করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে যাবার পথ সহজ করে দেন। আর ফেরেশতারা তালিবে ইলমদের(জ্ঞান অর্জনরত ছাত্রদের) জন্য নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেয়। আর আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে এমনকি পানির মাছও আলিমের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করে। আর আবিদের (ইবাদতকারীর) ওপর আলিমের শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে সমগ্র তারকামণ্ডলীর ওপর চাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের মতো। অবশ্য আলিমগণ হচ্ছেন, নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ তাঁদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে দিরহাম ও দীনার রেখে যান না। তাঁদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ইলম (জ্ঞান) রেখে যান। কাজেই যে ব্যক্তি তা আহরণ করেছে সে পুরো অংশই লাভ করেছে।
[আবু দাউদ ও তিরমিজী;  রিয়াদুস সলিহীন, বই ১৩, ইলম-জ্ঞান-প্রজ্ঞার মর্যাদা ও গুরুত্ব অধ্যায়,  হাদিস ১৩৮৮]
.
“   দৃষ্টিবান আর দৃষ্টিহীন সমান নয়।সমান নয় অন্ধকার ও আলো। সমান নয় ছায়া ও তপ্তরোদ।আরও সমান নয় জীবিত ও মৃত। আল্লাহ শ্রবণ করান যাকে ইচ্ছা। তুমি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নও।তুমি তো কেবল একজন সতর্ককারী। আমি তোমাকে[মুহাম্মাদ(ﷺ)] সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছি সংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। এমন কোন সম্প্রদায় নেই যাতে সতর্ককারী আসেনি। তারা যদি তোমার প্রতি মিথ্যারোপ করে—তাদের পূর্ববর্তীরাও তো মিথ্যারোপ করেছিল। তাদের কাছে তাদের রাসুলগণ স্পষ্ট নিদর্শন, সহীফা এবং উজ্জল কিতাবসহ এসেছিলেন।অতঃপর আমি অবিশ্বাসীদের পাকড়াও করেছিলাম। কেমন ছিল আমার শাস্তি!
তুমি কি দেখোনি, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টিবর্ষণ করেন, অতঃপর এর দ্বারা আমি বিভিন্ন বর্ণের ফল-মূল উদগত করি। পর্বতসমূহের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথ-সাদা, লাল ও নিকষ কালো।অনুরূপভাবে বিভিন্ন বর্ণের মানুষ, জন্তু, চতুস্পদ প্রাণী রয়েছে।
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।“
(কুরআন, ফাতির ৩৫:১৯-২৮)

পরীক্ষা যদি নাইবা আসতো তবে আমি এই পথকে সন্দেহ করতাম।


.

.
প্রতি সপ্তাহে জেল সুপার আমার সেলের সামনে দিয়ে হেটে যেত, আর বাইরে দাড়িয়ে আমাকে দেখতো। একদিন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে কেন সলিটারিতে রেখেছো? সুপার বললো, কারন তুমি সন্ত্রাসী আর তুমি অন্যদেরকেও সন্ত্রাসী বানাচ্ছো। আমি বললাম, তোমার প্রমান কি? সে বললো, মুসলিম জেলার তোমার ব্যাপারে একটা লম্বা রিপোর্ট লিখে আমাকে দিয়েছে, সেখানে সে এটা উল্লেখ করেছে।
.
.
মুসলিম জেলার আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়েছিল। এজন্য উম্মাহর সমস্যা হল মুনাফিকরা। যে মুসলিম জেলার আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেছিল সে মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে পরিচিত মুখ ছিল। নিজেকে সালাফি দাবি করতো। আমি নিজে জেলে যাবার আগে তাকে  চিনতাম না তবে সে নিজেই আমাকে জানিয়েছিল, তার সাবেক স্ত্রী এবং তার মেয়ে নিয়মিত আমার ক্লাসগুলোতে উপস্থিত থাকতো।
.
.
সলিটারি কনফাইনমেন্টের অবস্থা এতোই খারাপ ছিল যে ক’মাস আমি ওখানে ছিলাম, অনেকেই সেখানে মারা গিয়েছিল। এক সময় আমাকে আর আমার বাবাকে একটি সেলে রাখা হয়। বাবা থাকতেন নিচের বাঙ্কে আর আমি উপরেরটাতে। একটা জায়নামায বিছানো মত জায়গা সেলের ভেতরে ছিল না। উপরের বাঙ্কে শুয়ে আমি দেখতাম আমার বাবা সালাহ পড়ছেন, ক্বুর’আন তিলাওয়াত করছেন। সব সময় মুখের হাসি লেগে আছে। শুধুমাত্র রাতের অন্ধকারে সালাতে সিজদায় গিয়ে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন আর কাঁদতেন।
.
.
একদিন আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, “হে আমার পিতা! আপনার মনে কি কখনো সন্দেহের উদয় হয় না? যে পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, জেল-যুলুম নির্যাতন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন, পুরো দুনিয়া আপনাকে তো বটেই আপনার পরিবারকেও ত্যাগ করেছে, সম্পত্তি হারিয়েছেন, চেনাজানা মানুষরা সব হারিয়ে গেছে, প্রায় সব কিছু হারিয়েছেন – এতো কিছুর পরও আপনার মনে কি সন্দেহের উদয় হয় না?”
.
.
প্রশ্নটা শোনামাত্র বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, তিনি আমার চোখে চোখ রেখে বললেন – “পুত্র! বরং যদি এ পরীক্ষাসমূহ আপতিত না হতো তাহলে আমি এ পথকে সন্দেহ করতাম। যদি এসবকিছু নাহতো তাহলেই আমার মনে সন্দেহের উদয় হতো।“  
.
.
একজন দ্বীনদার ব্যক্তি যে আদর্শের উপর অটল থাকে, তাকে অবশ্যই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, যে আদর্শ প্রচার করবে তার কথা বাদই দিলাম। দুঃখজনক বিষয়টা হল অপরাধী, মাফিয়াসদস্য, খুনী, কমিউনিস্টদের জীবনী পড়ে দেখবেন, যারা উদ্ভট সব আদর্শে বিশ্বাসী – এদের জীবনী পড়ে দেখবেন তাদের অর্থহীন কলুষিত আদর্শের জন্য তারা যতোটুক সাবর করেছে, আজকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- কালিমাতে বিশ্বাসীরা অতোটুক সাবর করতে রাজি না। বিস্ময়কর।
.
.
জীবনে অনেক পরীক্ষা থাকে যেগুলো অনিবার্য। এগুলোকে এড়ানোর কোন উপায় থাকে না। আপনার সাবর করা ছাড়া অন্য কোন সুযোগ থাকে না। কিন্তু দাওয়াহর ক্ষেত্রে সাবরের ব্যাপারটা আলাদা। কারন এক্ষেত্রে আপনি চাইলে কষ্ট, বিপদ এড়িয়ে যেতে পারেন। আমার দাওয়াহর জন্য আমাকে নিয়ে কথা হচ্ছে, কিংবা আমার বিপদ হবার সম্ভাবনা আছে – “থাক, আমি বাসায় আমার বউ-বাচ্চা নিয়ে বসে থাকি”। এজন্য দাওয়াহর জন্য সাবর করা সবচেয়ে উত্তম সাবরের অন্তর্ভুক্ত। কারন আপনি স্বেচ্ছায় সাবর করছেন। এধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহ আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করছেন।
.
.
সবসময় এ বিষয়গুলো নিজের চিন্তায় ও হৃদয়ে ধারন করবেন। আমাদের জীবন শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। এ পথে কষ্ট আসবেই, পরীক্ষা আসবেই। যখন অবস্থা এমন দাঁড়াবে যে আপনার মনে হবে আপনি আর পারছেন না, তখন শুধু জান্নাতে প্রথম মূহুর্তটার কথা মনে করবেন। সবসময়। শুধু প্রথম মূহুর্তটা। দুনিয়ার সবচাইতে হতভাগ্য লোকটিকে বিচারের দিনে এক মুহুর্তের জন্য জান্নাতের স্বাদ পাবার পর, এক সেকেন্ড না, এক মিলিসেকেন্ড না, তার চাইতেও কম সময়ের জন্য জান্নাতের স্বাদ পাবার পর আগেকার সবকিছু ভুলে যাবে। দৃশ্যটা শুধু একবার চিন্তা করুন।  
-শায়খ আহমেদ মুসা জিব্রিল হাফিযাহুল্লাহ
Explanation of the Three Fundamental Principles
ঈষৎ সম্পাদিত ও পরিমার্জিত
লিখেছেন :আসিফ আদনান।

Tuesday, June 28, 2016

ব্লাড মুন ও দাজ্জাল এবং বিশ্ব।


লিখেছেন:Asif Adnan
তার সম্পর্কে আমি তোমাদেরকে সতর্ক করছি। এমন কোন নাবী নেই যিনি তাঁর কাওমকে এ বিষয়ে সতর্ক করেননি। তবে তার সম্পর্কে আমি তোমাদের এমন একটি কথা বলব যা কোন নাবীই তাঁর জাতিকে বলেননি। তা হল যে, সে কানা হবে আর আল্লাহ্ অবশ্যই কানা নন।
[বুখারী শরীফ]
.
.
“দাজ্জাল ততক্ষণ পর্যন্ত বের হবে না, যতক্ষণ না মানুষ তার কথা ভুলে যাবে, মিম্বর থেকে দাজ্জালের আলোচনা উঠে যাবে।”
[মাজমা আল যাওয়াইদী]
.
.
গত সপ্তাহের চাঁদ আসলেই অন্যরকম ছিল। না, আমি শুধু ব্লাড মুনের রক্তাভ আভার কথা বলছি না। ২৮ তারিখের চাঁদটা দেখতে সাধারণের চাইতে একটু বড় ছিল, এজন্যও বলছি না। ব্লাড মুন মোটামুটি রেয়ার একটা ঘটনা হলেও, সেপ্টেম্বর ২৮ এর ব্লাড মুন ছিল গত ১৮ মাসে চতুর্থ ব্লাড মুনের ঘটনা। প্রথম দুটি ছিল, ছিল গত বছরের এপ্রিলের ১৫ ও অক্টোবরের ৮ তারিখ। সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখের আগে, এই বছরেরই এপ্রিলের ৪ তারিখ আবারো ব্লাড মুন দেখা দেয়। ছয় মাস পর পর ৪ টি ব্লাড মুনের এই সাইকেলকে বলা হয় টেট্র্যাড (Tetrad)। টেট্র্যাড ব্লাড মুনের চাইতেও রেয়ার।
.
.
মুসলিমদের মতো ইহুদীরাও বছরকে চান্দ্র মাসে ভাগ করে হিসেব করে। ইহুদীদের কিতাবাদি এবং আলেমদের মতে, ব্লাড মুন ইহুদিদের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনে। তবে, যদি ব্লাড মুনগুলো কোন ইহুদী ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিনে হয়, তবে সেটা তাদের জন্য কল্যান বয়ে আনবে। গত পাঁচশ বছরে মাত্র চারবার ব্লাড মুন টেট্র্যাড ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব বা অনুষ্ঠানের সাথে মিলে গেছে। এটি প্রথমবার ঘটে ১৪৯২ সালে। ইতিহাস বইগুলোতে ১৪৯২ সাল ক্রিস্টফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের জন্য প্রসিদ্ধ। কিন্তু অনেকেই জানেন না, স্পেনের রাজা ফারডিন্যান্ড এবং রানী ইসাবেলা, ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে প্রায় দুই লক্ষ ইহুদীকে বহিস্কার করেন। রাতারাতি উদ্বাস্তু বনে যাওয়া এই ইহুদীরা একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পায় নব আবিষ্কৃত আমেরিকায়।সম্ভাব্য একটি ট্র্যাজিডি থেকে বেঁচে যায় ইহুদীরা।
.
.
পরের বার টেট্র্যাড ব্লাড মুনের তারিখ ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসবের দিনের সাথে মিলে যায় ১৯৪৮ সালে। আমাদের মুসলিমদের কাছে ১৯৪৮ সালটা অপমানের এবং পরাজয়ের। ইহুদীদের কাছে ১৯৪৮ এক মহান বিজয়ের বছর। এই বছর পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে অসংখ্য নিরীহ মুসলিমের রক্ত আর পুরো মুসলিম উম্মাহর স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় যায়নিস্ট “স্টেইট অফ ইস্রায়েল”।
.
.
১৯৬৭ ছিল টেট্র্যাড ব্লাড মুন আর বানী ইস্রাইলের উৎসবের দিনক্ষণ মিলে যাবার পরের বছর। এই বছর জুনের ৭ তারিখ, হাজার বছর অপেক্ষার পর, “ছয় দিনের যুদ্ধের” মাধ্যমে ইহুদীরা জেরুসালেম এবং টেম্পল মাউন্টের (ইনক্লুডিং মাসজিদুল আকসা) নিয়ন্ত্রন ফিরে পায়। ইহুদীরা বিশ্বাস করে সুলাইমান আলাহিস সালাম এর বানানো মাসজিদের (তাদের ভাষায় টেম্পল) জায়গাতেই মেসায়াহ তৃতীয় মন্দির পুনঃনির্মাণ করবে।
.
.
টেট্র্যাডের চারটির মধ্যে আর বাকি থাকে একটি। সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৫ ছিল সেই চতুর্থ ব্লাড মুন। ১৪৯২, ১৯৪৮, ১৯৬৭ এই তিনটি বছরই বানী ইস্রাইলের জন্য অত্যন্ত কল্যাণময় (অন্তত বাহ্যিক দৃস্টি ও পার্থিব বিচারে) বছর ছিল। কিন্তু বর্তমানে ইস্রাইলের অবস্থাটা কেমন যেন গোলমেলে। সুস্পষ্ট কোন সাফল্যের আভাস এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং এ বছরে কয়েক বার জেরুসালেমেই ইহুদীদের সিন্যাগগে হামলা হয়েছে। ইহুদীদের উপর খোলা রাস্তাতেও ফিলিস্তিনী সিভিলিয়ানরা কিছু আক্রমন চালিয়েছেন। অবশ্য ইস্রাইল এসব কিছুর মধ্যে দিয়েই নিয়মিত মুসলিমদের পাইকারী হারে হত্যা করে যাচ্ছে। হিজাব না খোলার জন্য রাস্তায় গুলি করে মারছে, বাসার ভেতর ঢুকে মুসলিমদের হত্যা করছে, কোলের শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে মারছে, ইত্যাদি। তবে এগুলো নিয়মের ব্যতিক্রম না। ইহুদী নিয়ন্ত্রিত ফীলিস্তিনে, গত প্রায় সত্তর বছর ধরে মুসলিমদের সাথে এরকমই হয়ে আসছে।
.
.
মুসলিমদের এভাবে হত্যা করা, তাদের উপর যুলুম করা এটা ইস্রাইলে ইহুদীদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ। এখানে কোন মহাসাফল্য আপাতত দেখা যাচ্ছে না। রিসেন্টলি ইহুদীরা আল-আকসার ব্যাপারে কিছুটা হার্ড লাইনে গেছে। বেশ কয়েক বার সশস্ত্র যায়োনিস্টরা পবিত্র আল-আকসার কম্পাউন্ডে ঢুকেছে। মাসজিদের খাদেম এবং মুসল্লীদের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়েছে। আল আকসা নিয়ে তারা আরেকটু অ্যাগ্রেসিভ হয়েছে। কিন্তু এটাকেও ঠিক ঐভাবে বিশাল কোন সাফল্য বলা যায় না। চিন্তা করুন, ১৪৯২ সালে তারা মোটামুটী নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বলা যায় এরকরম “আলৌকিক” ভাবে বেঁচে গেল। ১৯৪৮ এ মিলেনিয়া পর, দেশে দেশে বিতাড়িত জীবন যাপনের পর “এরেটয ইস্রাইল/ল্যান্ড অফ ইস্রাইলে” তারা ফেরত আসলো। ১৯৬৭ সালে হাজার বছরে প্রথম বারের মত জেরুসালেমের উপর তাদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল।
.
.
প্রতিবারই টেট্র্যাড ব্লাড মুনের তারিখ মিলে গিয়েছিল তাদের কোন উৎসব বা অনুষ্ঠানের দিনের সাথে। এবছরের সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখেও তাই হয়েছে। ২৮শে সেপ্ট

Thursday, June 16, 2016

ফেরা -একজন কট্টর নাস্তিক থেকে আস্তিক

কট্টর নাস্তিক রুবেনের সোজা জবাব ছিলো, মুসলমানরা জঙ্গী সন্ত্রাসী, ওই ধর্মকে গ্রহণ করার কোনো প্রশ্নই আসেনা।
অস্ট্রেলিয়ার তরুণ রুবেন জানান, তার বাবা মা তাকে শিখিয়েছেন আমরা প্রাকৃতিক নিয়মে জন্ম নিয়েছি, এই প্রাকৃতিক নিয়মগুলি প্রাকৃতিক ভাবেই ছিল আর প্রাকৃতিক ভাবেই থাকবে। প্রকৃতি নিজেকে স্রষ্টা দাবি করেনা, এমনি এমনিই নিয়মগুলি হয়েছে, এমনি এমনিই পানি থেকে জীবন এসেছে, এতে কোনো স্রষ্টা লাগেনি, তাই স্র্রষ্টা নেই। আবার একদিন আমরা এমনি এমনিই মরে যাবো, প্রকৃতির অংশ হয়ে যাবো, মরার পরে কোনো কোর্ট কাচারী নেই, এসব বাজে কথা।
বাবাকে বললাম, চাঁদে পানি থাকবেনা কিন্তু পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশ পানি থাকবে, অথচ সবগুলিই গ্রহ উপগ্রহ। আবার বিমান দুর্ঘটনায় সবাই মরে যায়, একটা শিশু বেঁেচ থাকে, অথচ সবাই বাঁচতে চেয়েছিলো। এটা প্রকৃতি কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় আর কে তা ডিজাইন করে ? বাবা বললেন এমনি এমনিই হয় ।
বাবার কথায় আমি কট্টর নাস্তিক ছোটবেলা থেকে। ঈশ্বর বিহীন জগতে বাবাকে ঈশ্বরের মত ভাবতাম, কিন্তু তিনি আমার মাকে ছেড়ে চলে গেলেন, প্রথম ধাক্কা খেলাম জীবনে, এটাও কি এমনি এমনি প্রাকৃতিক নিয়ম, তাহলে আমার বন্ধুর পিতা মাতা এত সুখী কেন ?
মাত্র ১৮ বছর বয়সে আমার সেই বন্ধুটিও এমনি এমনিই মরে গেলো, কি আজব মরণ, মনে হলো বেড়ে দেয়া গরম ভাত দুই মিনিটে ঠান্ডা হয়ে গেছে, তার জীবনটা সে শুরুই করতে পারেনি, এমনি এমনি এত সহজে প্রকৃতি তাকে নিয়ে গেলো ? ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির ফর্মুলার মতো অক্সিজেন আর হাইড্রজেন মিলালে যদি পানি হয়, মানুষের জীবন কেন একই ধরনের প্রাকৃতিক ফর্মুলায় চলেনা ?
কেউ ধনী অথচ অসুখী আর গরীব অথচ সুখী, কিন্তু ফর্মুলা অনুযায়ী সব ধনীর সুখী থাকার কথা। পদার্থের ফর্মুলার জগত আর মানুষের ফর্মুলার জগতে পার্থক্য কেন ? এমনি এমনি ? এই প্রকৃতির মাঝে একটা কন্ট্রোল রুম না থাকলে এরকম তো হওয়ার কথা নয়।
কোনো জবাব নেই আমার কাছে-কেন আমি, কে আমি, কোথায় আমি? প্রকৃতির সব প্রাণী একরকম মানুষ শুধু অন্যরকম, এটি কি এমনি এমনি হয়েছে ? ড্রিংকস করতে শুরু করলাম, পুলিশেও ধরলো। একজন তরুণের জীবনের কঠিন হতাশা আমাকে চেপে ধরলো।
মৃত বন্ধুটির কথা প্রায়ই মনে হতো। ভাবতাম আমি যদি কাল ওর মতই মরে যাই তাহলে কি হবে ? কিছুই না! সাত বিলিয়ন লোকের পৃথিবীতে আমার পরিচিত মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাত্র জানবে ছেলেটি মরে গেছে। কিন্তু মানব জীবন কি কুকুর বিড়ালের মৃত্যুর মতো এতই ছোট, এতই অর্থহীন, উদ্দেশ্য বিহীন হতে পারে ? আমার অস্তিত্বের মধ্যে এক আজব শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করলাম। তখন মনে হলো বাবার শেখানো প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে অবশ্যই মানুষের জন্যে কিছু একটা আছে, থাকতেই হবে। তা না হলে মানুষেরা আলাদা কেন ? শুধু মানুষকে যা খুশী ভাবার বুদ্ধি আর যুক্তি বোঝার মন দেয়া হলো কেন ? আর সব প্রাণীর বুদ্ধি আছে হয়তো কিন্তু যুক্তি বোঝেনা কেন ?
মনে হলো মানুষের এই অসহায় শুন্যতা পূরণের জন্যে হয়তো ধর্মের উদ্ভব হয়েছে। আমার অসহায়ত্ব আর একাকীত্ব ঘুচানোর জন্যে ভাবলাম ধর্মকে ব্যবহার করে দেখি।
অস্ট্রলিয়ান হিসাবে সোজা খ্রিস্ট ধর্মকেই ধরলাম। ভাবলাম গাড়ির কাঁচে স্টিকার লাগাবো, ‘আই লাভ জেসাস’ তারপরে নিষিদ্ধ জায়গায় পার্কিং করে জরিমানা না খেলে ভাববো ঈশ্বর আছেন। খ্রিস্ট ধর্মের সব গ্রুপের বিশ্বাস নিয়ে পড়াশুনা করলাম,পন্ডিতদের সাথে বসলাম-আমার জবাব মিললোনা, তাদের কথাবার্তা ভালো ছিলো, কিন্তু মনে হয়নি তারা আমার শুন্যতা পূরণের উপযোগী ধর্মের কথা বলছেন।
অবাক লাগলো, ঈশ্বর তার অলৌকিক সন্তানকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে অসহায় ভাবে তার পুত্রকে ক্রুসিফাই করালেন, তাতে বাকি সবাই পাপমুক্ত হয়ে গেলো। আবার পবিত্র আত্মার উপস্থিতি পিতা পুত্রের মাঝখানে, সবাই ঈশ্বর পার্টনার। ঈশ্বর একাই তো যথেষ্ঠ হওয়া উচিত, যদি উনি ঈশ্বর হয়ে থাকেন। ঈশ্বর কেন আমার বাবার মতো সংসার পেতে বসবেন আর আমাকে যখন ঝুলাচ্ছে তখন চুপ করে দেখবেন, যৌক্তিক লাগলোনা। মনে হলো অযৌক্তিক কথা-বার্তার কারণেই গীর্জাগামীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
হিন্দু ধর্ম দেখলাম। আমার কাজের জায়গায় হিন্দু সহকর্মীরা ছিলো, আমরা ধর্ম নিয়ে সারাক্ষণ কথা বলতাম, আমি ঝগড়া করতামনা কারণ ওরা ভালো বন্ধুও ছিলো। ওরা বলতো তোমার সম্পদের ব্যাপারে একজন দেবতাকে বিশ্বাস করতে হবে, আবার বিদ্যার ব্যাপারে আর একজন দেবতাকে, এভাবে সব প্রয়োজনের জন্যে আলাদা আলাদা দেবতাকে বিশ্বাস করতে হবে। আমি তখন বলতাম, কাম অন ম্যান, দেবতাদের মধ্যে যদি ডিপার্টমেন্টাল তর্ক লেগে যায়, তখন কি হবে ?
ইহুদী ধর্ম দেখলাম, নতুন কিছু পেলামনা। বুদ্ধকে ভালো লাগলো। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ নিজের সম্মন্ধে যা বলেছেন তাতে একজন প্রেরিত পুরুষের মত কোনো কথা নেই। আমার যে মৌলিক প্রশ্ন, ‘আমি কেন পৃথিবীতে এসেছি’-তার কোনো জবাব পেলামনা এই ধর্মে, অথচ অনেক সুন্দর কথা আছে।
তখন আমার এক খ্রিস্টান বন্ধু বলল, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে দেখো ।
নাহ ম্যান, ওরা তো সন্ত্রাসী! আমি কোনো মসজিদের ধারে কাছে যাবো না, কখনো-ই না। কিন্তু কদিন পরে আমি কেন জানিনা প্রেস্টন এলাকার মসজিদের সামনে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। মসজিদে ঢুকে পড়লাম পায়ের জুতো না খুলেই। এ সময় এক ব্যক্তি নামাজ পড়ছিলেন ও সিজদারত অবস্থায় ছিলেন। আমি সরাসরি তার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। আমি তার নামাজ পড়ার দৃশ্য দেখতে লাগলাম। এ অবস্থায় মসজিদের আলেম আবু হামজাহ হাসিমুখে আমাকে স্বাগত জানাতে এলেন ও তার কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে আমি স্রষ্টা ও ইসলাম সম্পর্কে যখন নানা প্রশ্ন করছিলাম তখন তিনি জবাব দিচ্ছিলেন শুধু কোরানের উদ্ধৃতি দিয়ে।
এরপর যতবারই আমি যাকেই প্রশ্ন করেছি কেউ তার মন থেকে নিজস্ব কোনো জবাব দেয়নি, সবাই আমার হাতে কোরান ধরিয়ে বলত এই দেখো তোমার প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ এভাবে দিয়েছেন। অথচ আমি যখন পাদ্রীদের কাছে যেতাম বাইবেল দেখিনি কখনো। তারা তাদের নিজস্ব যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। দু-একজন দু-একবার বাইবেল পড়ে উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন অবশ্যই। কিন্তু প্রতিটি মসজিদে আমি যখনই প্রশ্ন নিয়ে গিয়েছি, জবাবে তারা কোরান নিয়ে এসেছেন ।

আমি পরিস্কার বুঝে গেলাম, ইসলাম ধর্মকে তার অনুসারীদের প্রশ্নবোধক কার্য্যকলাপ দেখে বোঝা যাবেনা। ইসলাম আসলে একটি গাইড বই, যে এটি অনুসরণ করছে ঠিকঠাক সে ইসলামে ঢুকে গেছে, তার নাম হয় মুসলিম। আর যে অনুসরণ করছেনা তার নাম আর পাসপোর্টে মুসলিম লেখা থাকলেও সে তা নয় প্রকৃত পক্ষে।
এই সত্য অনুধাবন করার পর আমি কোরান পড়তে শুরু করি, ৬-৭ মাস অধ্যয়ন করার পর আমার মাথায় অনেক প্রশ্ন হাজির হয়, তখন আমার বয়স ২০।
এইরকম বয়সে আমি কিভাবে মুসলমান হলাম, সে এক অদ্ভুত হাস্যকর কাহিনী।
একদিন রাতে আমার কয়েকজন অস্ট্রলিয়ান বন্ধু বড় অক্ষরে ছাপানো এক খন্ড কোরানুল করিম দিলো। আমার কাছে ছোট অক্ষরের কোরান আগেও ছিলো। সেদিন রাতে কেন জানি আমি বিছানায় বসলাম সেই কোরান খন্ড হাতে নিয়ে। পাশে জ্বালালাম একটি মোমবাতি। জানালা খুলে দিলাম। গ্রীষ্ম কালের একটি সুন্দর সোনালী সন্ধ্যা। আবহাওয়া চমৎকার, চারিদিক নির্জন। একটা পবিত্র অনুভুতি অনুভব করছিলাম, অতি সুন্দর।
কোরান পড়া শুরু করলাম অন্যান্য রাতের মতো আর ভাবনা গুলো খেলতে শুরু করলো মাথার ভেতরে। মনে হলো বইটিতে ঠিক সেই কথাগুলিই লেখা আছে যা একজন সৃষ্টি কর্তার তরফ থেকে হওয়া উচিত। আবার এক ধরনের দ্বন্দও কাজ করছিলো, কি জানি হয়ত ঈশ্বরই নেই, আমি ঠিক বোঝাতে পারবোনা, আমার কারো সহায়তা দরকার ছিল তখন ধাতস্ত হতে, আমি কোরান হাতে ধরে সোজা হয়ে বসলাম।
বললাম ও ঈশ্বর, তুমি যদি থেকেই থাকো আমাকে একটা চিহ্ন দেখাওতো, ভালো বা বড় কিছু। যেমন ধরো এই গরমে এখানে বজ্রপাত হয়না, এখন তুমি যদি আকাশ ফাটিয়ে প্রচন্ড শব্দে একটা ফেলে দাও, আমি বুঝব তুমি আছ। অথবা নিঃশ্বব্দে একটা বিদ্যুৎ চমক দেখাও আকাশের দিগন্তে আলোক ছটা নিয়ে, যদি তুমি এরকম শোনাও বা দেখাও-আমি তোমার, তোমারই গোলাম হয়ে যাবো, কথা দিলাম ।
আকাশে তারা ছাড়া আর কোনো আলো নেই, বজ্রপাত তো দুরের কথা জেট বিমানেরও কোনো শব্দও এলোনা।
ঠিক আছে অসময়ে বজ্রপাতের জন্যে হয়তো তুমি রাজি নও ঈশ্বর, তাহলে মটমট করে একটা ডাল বা কোনো কিছু ভাঙ্গার শব্দ শোনাওনা। কিছু কানে এলোনা।
ঠিক আছে ঈশ্বর, আমার সামনে যে মোমবাতিটি জ্বলছে তার শিখাতে একটা বিস্ফোরণ ঘটাও দুই ফুট উচু সিনেমায় যেমন দেখায়, আমি মুগ্ধ হয়ে তোমাকে বিশ্বাস করবো। মোমবাতি মিটমিট করেই জ্বলতে রইলো।
আমি অপেক্ষায় অথচ কিছু ঘটছেনা একটু হতাশা আর গোস্বা অনুভব করলাম। বললাম ঈশ্বর, তুমি নিজেকে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবি করো অথচ আমাকে তোমার কোনো চিহ্ন দেখাতে পারলে না! ঠিক আছে আমি তোমাকে আর একটা সুযোগ দিচ্ছি, বজ্রপাতটি একটু বেশি চাওয়া হয়ে গেছে, সব সময় যা হয় সেরকম কিছু করাও, একটা গাড়ীকে লম্বা হর্ন দিয়ে রাস্তা দিয়ে পার করাও, আমি এত ছোট কিছু চাইছি তোমাকে বিশ্বাস করার জন্যে। ধরে নেবো এটাই আমার জন্যে তুমি আছ তার চিহ্ন ঠিক আছে ?
অবাক কান্ড, ঈশ্বর একটা ট্যাক্সিও খুজে পেলেন না যেটা হর্ন দেয় ! মনটা খারাপ হলো, চুপ মেরে আছি। মনে হলো আমি মহাশুন্যের নিস্তবদ্ধতায় বসে আছি, একটি পিপড়ার পদশব্দও শুনছি না, আমি একটু ভেঙ্গেই পড়লাম, ভেবেছিলাম আজকের এই মুহুর্তটিতে আমি কিছু একটা খুঁজে পাবো, যা ঈশ্বর থাকার নিদর্শন। না কিছু হলনা।
হতাশ হয়ে অলস ভঙ্গীতে কোরান হাতে উঠিয়ে পৃষ্ঠা উল্টাতেই চোখ আটকে গেলো একটি আয়াতের দিকে, “বিশ্বাসীদের জন্যে আকাশ ও পৃথিবীতে নিদর্শন রয়েছে। তোমাদের সৃষ্টিতে আর চারদিকে ছড়িয়ে রাখা জীব-জন্তুর সৃজনের মধ্যেও নিদর্শনাবলী রয়েছে। দিন ও রাতের পরিবর্তনে আর বৃষ্টির পরে পৃথিবীকে তার মৃত্যুর পর আবার জীবিত করা হয়, তার মধ্যে আর বায়ুর পরিবর্তনে, এসবই তো নিদর্শন’। (৪৫:৩-৫)
হটাৎ মর্মে অনুধাবন হলো ছোট বেলা বাবা বলেছিলেন, এমনি এমনি হয় প্রাকৃতিক নিয়মগুলি, আমার বোঝা হয়ে গেল এমনি এমনি কিছু হয়না তাতে একজন ডিজাইনার লাগে, তিনি আমাকে তার উপস্থিতি জানিয়েছেন। আমি মুসলিম হবো।
পরদিন সন্ধ্যায় রমজানের প্রথম রাতে আমি যখন মসজিদে অপেক্ষা করছিলাম, আর অসংখ্য মুসলমান তারাবী নামাজ পড়ছিল তখনও এক ধরনের ভয় কাজ করছিলো মনের ভেতর, কিন্তু যখন শেখ ফাহমী আমাকে সত্যই শাহাদা পড়াচ্ছিলেন, কোথায় চলে গেলো সব দ্বিধা, মনে হলো কাদেরকে ভাবতাম এতোদিন জঙ্গী সন্ত্রাসী। মনে হচ্ছিলো আমি একা কোথাও দাঁড়িয়ে, মাথার ওপর গড়িয়ে পড়ছে ঠান্ডা জল, অদ্ভূত এক পবিত্র স্নানে নির্মল হয়ে উঠছে আমরা সর্বাঙ্গ, তনু-মন। সব ভায়েরা আমাকে আলিঙ্গন করে যাচ্ছে মায়া আর ভালবাসার স্পর্শ নিয়ে। আমি প্রস্ফুটিত হয়ে উঠছি।
১৯৯৬ সনে রুবেন মাত্র ২০ বছর বয়সে আবু বকর নাম ধারণ করেন আর বলেন, পশ্চিমারা ধর্মান্তরিত হলে বলে কনভার্ট, মানুষ যখন ইসলাম ধর্মে ঢোকে সে কনভার্ট নয় সে হয় রিভার্ট, যিনি ফিরে আসেন। মুসলিম কোনো নাম নয়, মুসলিম একটি ক্রিয়াপদ, ভার্ব। আমার বাসার পেছনে যে বড় গাছটি আছে সে আল্লাহর হুকুম পালন করছে, আল্লাহ তাকে যা নির্দেশ দিয়েছেন তাই মেনে চলছে। গাছটি আমার কাছে মুসলিম। সে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে।
যখন একটি বাচ্চার জন্ম হয় তখন ক্ষুধা লাগলে কাঁদে, সব বাচ্চারাই কাঁদে, এই প্রাকৃতিক নিয়ম সে আল্লাহর ডিজাইনে করে। সে তখন মুসলিম। যখন সে বড় হয় তখন সে অন্যদের কাছ থেকে নতুন কিছু শিখে এবং অন্যের আদর্শকে অনুসরণ করে মুসলিম থেকে সরে যায়। পরবর্তী সময়ে সে যদি ফিরে আসতে চায় সে রিভার্ট করছে নিজেকে, কনভার্ট নয়। কারণ আল্লাহ বলেছেন, আমি সব শিশুকে মুসলিম হিসেবে জন্ম দেই।
আমি ফিরে এসেছি মানুষের জন্যে এক অফুরন্তজীবনের উৎসে, আমি একজন মুসলিম, বাকিরাও তাই ছিলো, তারাও আসবে একদিন ফিরে ।
‘হে মানুষ, আমি তোমাদের এক পুরুষ আর এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে সে-ই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে বেশি সাবধানী। আল্লাহ সব কিছু জানেন, সব খবর রাখেন।’ (৪৯:১৩ )
– লিখেছেন আবু বকর
(তিনি একজন মনস্তত্ববিদ এবং একজন ফিল্ম-মেকার। প্রেস্টন ভিক্টোরিয়াতে তার নিবাস – “আমাদের সময়” পত্রিকায় তার এ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে )