Saturday, August 13, 2016

সুউচ্চ বিল্ডিং নির্মান বনাম কিয়ামাতের আলামত

নগ্নপদ নগ্নদেহ রাখালদের সুউচ্চ বিল্ডিং নির্মান ।
এই নগ্নপদ নগ্নদেহ রাখাল কারা জানেন ?
আরবরা । নবী করীম সা. কেয়ামতের নিদর্শন বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
নগ্নপদ নগ্নদেহ রাখালদের -সুউচ্চ বাড়ীঘর নির্মাণে প্রতিযোগিতায় মত্ত দেখবে।-” (মুসলিম)
হাদিসে উদ্দেশ্য হচ্ছে, পাহাড় পর্বত এবং সুদূর মরু প্রান্তরের রাখালেরা ছাগলের রাখালি ছেড়ে উঁচু উঁচু টাওয়ার নির্মাণে মত্ত হয়ে উঠবে। সকলেই চাইবে আমার-টা সবার চেয়ে উঁচুতে থাকুক!
বর্তমান আরব দেশগুলোতে এটা ব্যাপক মহামারীর আকার ধারণ করেছে।
প্রত্যেকটি দেশ-ই চাইছে, বিশ্বের সবচে’ দীর্ঘতম টাওয়ারটি তার দেশে হোক! এর জন্য যত টাকা দরকার হয়, খরচ করতে রাজী।
কে কার চেয়ে উচু করে বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারে.. কে কার চেয়ে বেশি ডিজাইন/ষ্টাইল করে বাংলো বানাতে পারে আজ সেই প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত আরবরা । অথচ এইতো কিছুদিন পূর্বেই তারা ছিল মেষপালের রাখাল। গায়ে ছিল না বস্ত্র, পায়ে ছিল না জুতো।
আমরা হাদিসের প্রমান আজ বাস্তবেই দেখতে পাচ্ছি দুবাই এর বিল্ডিং গুলো আজ মেঘের সাথে মিশে যাচ্ছে !
পৃথিবীর সবচেয়ে উচু বিল্ডিং হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত এর বুর্জ আল খলিফা । ১৬০ তলা বিশিষ্ট এই টাওয়ারটির উচ্চতা ৮২৮ মিটার বা ২৭১৬ ফিট ।
সৌদি আরব ইতিমধ্যেই এটাকে চ্যালেঞ্জ করে কিংডম টাওয়ার বানানো শুরু করে দিয়েছে যেটি হবে ৩০০ তলা বিশিষ্ট যার উচ্চতা হবে ১০০০ মিটার বা ৩২৮০ ফিট ।
এবার বুঝুন মুসলমানরা কেন আজ পরাজিত ? কেন আজ নির্যাতিত ?
কেননা যারা তাদের নেতৃত্ব দিবে সেই আরবরাই আজ আখেরাতের প্রতিযোগীতা
না করে দুনিয়ার প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত !
আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুক,আমিন।
-Rashed Ibn Adam

'সকল প্রশংসা কেনো স্রষ্টার?'

ক্লাশে নতুন একজন স্যার এসেছেন।নাম- মফিজুর রহমান।

হ্যাংলা-পাতলা গড়ন।বাতাস আসলেই যেনো ঢলে পড়বে মতন অবস্থা শরীরের।ভদ্রলোকের চেহারার চেয়ে চোখ দুটি অস্বাভাবিক রকম বড়।দেখলেই মনে হয় যেন বড় বড় সাইজের দুটি জলপাই, কেউ খোদাই করে বসিয়ে দিয়েছে।
ভদ্রলোক খুবই ভালো মানুষ।উনার সমস্যা একটিই- ক্লাসে উনি যতোটা না বায়োলজি পড়ান, তারচেয়ে বেশি দর্শন চর্চা করেন।ধর্ম কোথা থেকে আসলো, ঠিক কবে থেকে মানুষ ধার্মিক হওয়া শুরু করলো, 'ধর্ম আদতে কি' আর, 'কি নয়' তার গল্প করেন।
-
আজকে উনার চতুর্থ ক্লাশ। পড়াবেন Analytical techniques & bio-informatics। চতুর্থ সেমিষ্টারে এটা পড়ানো হয়।
স্যার এসে প্রথমে বললেন,- 'Good morning, guys....'
সবাই সমস্বরে বললো,- 'Good morning, sir...'
এরপর স্যার জিজ্ঞেস করলেন,- 'সবাই কেমন আছো? '
স্যারের আরো একটি ভালো দিক হলো- উনি ক্লাশে এলে এভাবেই সবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন।সাধারণত হায়ার লেভেলে যেটা সব শিক্ষক করেন না। তারা রোবটের মতো ক্লাশে আসেন,যন্ত্রের মতো করে লেকচারটা পড়িয়ে বেরিয়ে যান।সেদিক থেকে মফিজুর রহমান নামের এই ভদ্রলোক অনেকটা অন্যরকম।
আবারো সবাই সমস্বরে উত্তর দিলো।কিন্তু গোলমাল বাঁধলো এক জায়গায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন উত্তর দিয়েছে এভাবে- 'আলহামমমমদুলিল্লাহ ভালো।'
স্যার কপালের ভাঁজ একটু দীর্ঘ করে বললেন,- 'আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো বলেছো কে কে?'
অদ্ভুত প্রশ্ন। সবাই থতমত খেলো।
একটু আগেই বলেছি স্যার একটু অন্যরকম। প্রাইমারি লেভেলের টিচারদের মতো ক্লাশে এসে বিকট চিৎকার করে Good Morning বলেন, সবাই কেমন আছে জানতে চান।এখন 'আলহামদুলিল্লাহ্‌' বলার জন্য কি প্রাইমারি লেভেলের শিক্ষকদের মতো বেত দিয়ে পিটাবেন নাকি?
সাজিদের তখন তার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বাবুল চন্দ্র দাশের কথা মনে পড়ে গেলো।এই লোকটা ক্লাশে কেউ দুটোর বেশি হাঁচি দিলেই বেত দিয়ে আচ্ছামতন পিটাতেন। উনার কথা হলো- 'হাঁচির সর্বোচ্চ পরিমাণ হবে দু'টি। দু'টির বেশি হাঁচি দেওয়া মানে ইচ্ছে করেই বেয়াদবি করা।'
যাহোক, বাবুল চন্দ্রের পাঠ তো কবেই চুকেছে, এবার মফিজ চন্দ্রের হাতেই না গণ পিটুনি খাওয়া লাগে।
ক্লাশের সর্বমোট সাতজন দাঁড়ালো। এরা সবাই 'আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো' বলেছে। এরা হচ্ছে- রাকিব, আদনান, জুনায়েদ, সাকিব, মরিয়ম,রিতা এবং সাজিদ।
স্যার সবার চেহারাটা একটু ভালোমতো পরখ করে নিলেন। এরপর পিক করে হেসে দিয়ে বললেন,- 'বসো।'
সবাই বসলো। আজকে আর মনে হয় এ্যাকাডেমিক পড়াশুনা হবেনা। দর্শনের তাত্বিক আলাপ হবে।
ঠিক তাই হলো। মফিজুর রহমান স্যার আদনানকে দাঁড় করালো। বললেন,- 'তুমিও বলেছিলে সেটা, না?'
- 'জ্বি স্যার।'- আদনান উত্তর দিলো।
স্যার বললেন,- 'আলহামদুলিল্লাহ্‌'র অর্থ কি জানো?'
আদনান মনে হয় একটু ভয় পাচ্ছে। সে ঢোঁক গিলতে গিলতে বললো,- 'জ্বি স্যার, আলহামদুলিল্লাহ্‌ অর্থ হলো- সকল প্রশংসা কেবলি আল্লাহর।'
স্যার বললেন,- ' সকল প্রশংসা কেবলি আল্লাহর।'
স্যার এই বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করলেন।এরপর আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন,- 'বসো।'
আদনান বসলো। এবার স্যার রিতাকে দাঁড় করালেন। স্যার রিতার কাছে জিজ্ঞেস করলেন,- 'আচ্ছা, পৃথিবীতে চুরি-ডাকাতি আছে?'
রিতা বললো,- 'আছে।'
- 'খুন-খারাবি, রাহাজানি, ধর্ষণ?'
-- 'জ্বি,আছে।'
- 'কথা দিয়ে কথা না রাখা, মানুষকে ঠকানো,লোভ-লালসা এসব?'
- 'জ্বি, আছে।'
- 'এগুলো কি প্রশংসাযোগ্য?'
- 'না।'
'তাহলে মানুষ একটি ভালো কাজ করার পর তার সব প্রশংসা যদি আল্লাহর হয়, মানুষ যখন চুরি-ডাকাতি করে, লোক ঠকায়, খুন-খারাবি করে,ধর্ষণ করে, তখন সব মন্দের ক্রেডিট আল্লাহকে দেওয়া হয়না কেনো? উনি প্রশংসার ভাগ পাবেন, কিন্তু দূর্নামের ভাগ নিবেন না, তা কেমন হয়ে গেলো না?'
রিতা মাথা নিঁচু করে চুপ করে আছে।স্যার বললেন,- 'এখানেই ধর্মের ভেল্কিবাজি। ইশ্বর সব ভালোটা বুঝেন, কিন্তু মন্দটা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। আদতে, ইশ্বর বলে কেউ নেই।যদি থাকতো, তাহলে তিনি এরকম একচোখা হতেন না। বান্দার ভালো কাজের ক্রেডিটটা নিজে নিয়ে নিবেন, কিন্তু বান্দার মন্দ কাজের বেলায় বলবেন- 'উহু, অইটা থেকে আমি পবিত্র। অইটা তোমার ভাগ।'
স্যারের কথা শুনে ক্লাশে যে ক'জন নাস্তিক আছে, তারা হাত তালি দেওয়া শুরু করলো। সাজিদের পাশে যে নাস্তিকটা বসেছে, সে তো বলেই বসলো,- 'মফিজ স্যার হলেন আমাদের বাঙলার প্লেটো।'
স্যার বলেই যাচ্ছেন ধর্ম আর স্রষ্টার অসারতা নিয়ে।
-
এবার সাজিদ দাঁড়ালো। স্যারের কথার মাঝে সে বললো,- 'স্যার, সৃষ্টিকর্তা একচোখা নন। তিনি মানুষের ভালো কাজের ক্রেডিট নেন না। তিনি ততোটুকুই নেন, যতোটুকু তিনি পাবেন।ইশ্বর আছেন।'
স্যার সাজিদের দিকে একটু ভালোমতো তাকালেন।বললেন,- 'শিওর?'
- 'জ্বি।'
- 'তাহলে মানুষের মন্দ কাজের জন্য কে দায়ী?'
- 'মানুষই দায়ী।- সাজিদ বললো।
- 'ভালো কাজের জন্য?'
- 'তাও মানুষ।'
স্যার এবার চিৎকার করে বললেন,- 'এক্সাক্টলি, এটাই বলতে চাচ্ছি। ভালো/মন্দ এসব মানুষেরই কাজ।সো, এর সব ক্রেডিটই মানুষের।এখানে স্রষ্টার কোন হাত নেই। সো, তিনি এখান থেকে না প্রশংসা পেতে পারেন, না তিরস্কার।সোজা কথায়, স্রষ্টা বলতে কেউই নেই।'
ক্লাশে পিনপতন নিরবতা। সাজিদ বললো,- 'মানুষের ভালো কাজের জন্য স্রষ্টা অবশ্যই প্রশংসা পাবেন, কারন, মানুষকে স্রষ্টা ভালো কাজ করার জন্য দুটি হাত দিয়েছেন, ভালো জিনিস দেখার জন্য দুটি চোখ দিয়েছেন, চিন্তা করার জন্য মস্তিষ্ক দিয়েছেন, দুটি পা দিয়েছেন। এসবকিছুই স্রষ্টার দান।তাই ভালো কাজের জন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসা পাবেন।'
স্যার বললেন,- 'এই গুলো দিয়ে তো মানুষ খারাপ কাজও করে, তখন?'
- 'এর দায় স্রষ্টার নয়।'
- 'হা হা হা হা। তুমি খুব মজার মানুষ দেখছি।হা হা হা হা।'
সাজিদ বললো,- 'স্যার, স্রষ্টা মানুষকে একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন।এটা দিয়ে সে নিজেই নিজের কাজ ঠিক করে নেয়। সে কি ভালো করবে, না মন্দ।'
স্যার তিরস্কারের সুরে বললেন, - 'ধর্মীয় কিতাবাদির কথা বাদ দাও,ম্যান। কাম টু দ্য পয়েণ্ট এন্ড বি লজিক্যাল।'
সাজিদ বললো, - 'স্যার, আমি কি উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারি ব্যাপারটা?'
- 'অবশ্যই।'- স্যার বললেন।
সাজিদ বলতে শুরু করলো-
'ধরুন, খুব গভীর সাগরে একটি জাহাজ ডুবে গেলো। ধরুন, সেটা বার্মুডা ট্রায়াঙ্গাল। এখন কোন ডুবুরিই সেখানে ডুব দিয়ে জাহাজের মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে পারছে না।বার্মুডা ট্রায়াঙ্গালে তো নয়ই। এই মূহুর্তে ধরুন সেখানে আপনার আবির্ভাব ঘটলো। আপনি সবাইকে বললেন,- 'আমি এমন একটি যন্ত্র বানিয়ে দিতে পারি, যেটা গায়ে লাগিয়ে যেকোন মানুষ খুব সহজেই ডুবে যাওয়া জাহাজের মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে পারবে।ডুবুরির কোনরকম ক্ষতি হবে না।'
স্যার বললেন,- 'হুম, তো?'
- 'ধরুন, আপনি যন্ত্রটি তৎক্ষণাৎ বানালেন, এবং একজন ডুবুরি সেই যন্ত্র গায়ে লাগিয়ে সাগরে নেমে পড়লো ডুবে যাওয়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে।'
ক্লাশে তখন একদম পিনপতন নিরবতা। সবাই মুগ্ধ শ্রোতা।কারো চোখের পলকই যেনো পড়ছেনা।
সাজিদ বলে যেতে লাগলো-
'ধরুন, ডুবুরিটা ডুব দিয়ে ডুবে যাওয়া জাহাজে চলে গেলো। সেখানে গিয়ে সে দেখলো, মানুষগুলো হাঁসপাশ করছে।সে একে একে সবাইকে একটি করে অক্সিজেনের সিলিন্ডার দিয়ে দিলো। এবং তাদের একজন একজন করে উদ্ধার করতে লাগলো।'
স্যার বললেন,- 'হুম।'
- 'ধরুন, সব যাত্রীকে উদ্ধার করা শেষ।বাকি আছে মাত্র একজন। ডুবুরিটা যখন শেষ লোকটাকে উদ্ধার করতে গেলো, তখন ডুবুরিটা দেখলো- এই লোকটাকে সে আগে থেকেই চিনে।'
এতটুকু বলে সাজিদ স্যারের কাছে প্রশ্ন করলো,- 'স্যার, এরকম কি হতে পারেনা?'
স্যার বললেন,- 'অবশ্যই হতে পারে। লোকটা ডুবুরির আত্মীয় বা পরিচিত হয়ে যেতেই পারে। অস্বাভাবিক কিছু নয়।'
সাজিদ বললো,- 'জ্বি। ডুবুরিটা লোকটাকে চিনতে পারলো। সে দেখলো,- এটা হচ্ছে তার চরম শত্রু।এই লোকের সাথে তার দীর্ঘ দিনের বিরোধ চলছে।এরকম হতে পারেনা,স্যার?
- 'হ্যাঁ, হতে পারে।'
সাজিদ বললো,- 'ধরুন, ডুবুরির মধ্যে ব্যক্তিগত হিংসাবোধ জেগে উঠলো।সে শত্রুতাবশঃত ঠিক করলো যে, এই লোকটাকে সে বাঁচাবেনা। কারন, লোকটা তার দীর্ঘদিনের শত্রু। সে একটা চরম সুযোগ পেলো এবং প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠলো। ধরুন, ডুবুরি অই লোকটাকে অক্সিজেনের সিলিন্ডার তো দিলোই না, উল্টো উঠে আসার সময় লোকটাকে পেটে একটা জোরে লাথি দিয়ে আসলো।'
ক্লাশে তখনও পিনপতন নিরবতা। সবাই সাজিদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
স্যার বললেন,- 'তো, তাতে কি প্রমান হয়,সাজিদ?'
সাজিদ স্যারের দিকে ফিরলো। ফিরে বললো,- 'Let me finish my beloved sir....'
- 'Okey, you are permitted. carry on'- স্যার বললেন।
সাজিদ এবার স্যারকে প্রশ্ন করলো,- 'স্যার, বলুন তো, এই যে, এতগুলো ডুবে যাওয়া লোককে ডুবুরিটা উদ্ধার করে আনলো, এর জন্য আপনি কি কোন ক্রেডিট পাবেন?'
স্যার বললেন,- 'অবশ্যই আমি ক্রেডিট পাবো। কারন, আমি যদি অই বিশেষ যন্ত্রটি না বানিয়ে দিতাম, তাহলে তো এই লোকগুলোর কেউই বাঁচতো না।'
সাজিদ বললো,- 'একদম ঠিক স্যার। আপনি অবশ্যই এরজন্য ক্রেডিট পাবেন।কিন্তু, আমার পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে- 'ডুবুরিটা সবাইকে উদ্ধার করলেও, একজন লোককে সে শত্রুতা বশঃত উদ্ধার না করে মৃত্যুকূপে ফেলে রেখে এসেছে। আসার সময় তার পেটে একটি জোরে লাথিও দিয়ে এসেছে। ঠিক?'
- 'হুম।'
- 'এখন স্যার, ডুবুরির এহেন অন্যায়ের জন্য কি আপনি দায়ী হবেন? ডুবুরির এই অন্যায়ের ভাগটা কি সমানভাবে আপনিও ভাগ করে নেবেন?'
স্যার বললেন,- 'অবশ্যই না। ওর দোষের ভাগ আমি কেনো নেবো? আমি তো তাকে এরকম অন্যায় কাজ করতে বলিনি।সেটা সে নিজে করেছে।সুতরাং, এর পুরো দায় তার।'
সাজিদ এবার হাসলো। হেসে সে বললো,- 'স্যার, ঠিক একইভাবে, আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ভালো কাজ করার জন্য। আপনি যেরকম ডুবুরিকে একটা বিশেষ যন্ত্র বানিয়ে দিয়েছেন, সেরকম সৃষ্টিকর্তাও মানুষকে অনুগ্রহ করে হাত,পা,চোখ,নাক,কান,মুখ,মস্তিষ্ক এসব দিয়ে দিয়েছেন। সাথে দিয়েছেন একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি।এখন এসব ব্যবহার করে সে যদি কোন ভালো কাজ করে, তার ক্রেডিট স্রষ্টাও পাবেন, যেরকম বিশেষ যন্ত্রটি বানিয়ে আপনি ক্রেডিট পাচ্ছেন।আবার, সে যদি এগুলো ব্যবহার করে কোন খারাপ কাজ করে, গর্হিত কাজ করে, তাহলে এর দায়ভার স্রষ্টা নেবেন না।যেরকম, ডুবুরির অই অন্যায়ের দায় আপনার উপর বর্তায় না। আমি কি বোঝাতে পেরেছি,স্যার?'
ক্লাশে এতক্ষণ ধরে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছিলো। এবার ক্লাশের সকল আস্তিকেরা মিলে একসাথে জোরে জোরে হাত তালি দেওয়া শুরু করলো।
স্যারের জবাবের আশায় সাজিদ স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। স্যার বললেন,- 'হুম। আই গট দ্য পয়েণ্ট।'- এই বলে স্যার সেদিনের মতো ক্লাশ শেষ করে চলে যান।
'সকল প্রশংসা কেনো স্রষ্টার?'/ আরিফ আজাদ
(তৃতীয় পর্ব)
(কিছুদিন আগে বিশিষ্ট নাস্তিক আসিফ মহিউদ্দীন 'আলহামদুলিল্লাহ্‌' বলা নিয়ে ব্যঙ্গ করে, এবং গল্পে উল্লিখিত প্রশ্নগুলো করে একটি লেখা লিখেছিলো। এটা তার লেখার একটি পাল্টা জবাব হিসেবে লেখা)

তাকদির বনাম স্বাধীন ইচ্ছা'- স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত?

সাজিদের ব্যাগে ইয়া মোটা একটি ডায়েরি থাকে সবসময়।
ডায়েরিটা প্রাগৈতিহাসিক আমলের কোন নিদর্শনের মতো। জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া।ছেঁড়া জায়গার কোনটাতে সূতো দিয়ে সেলাই করা, কোন জায়গায় আঁটা দিয়ে প্রলেপ লাগানো, কোন জায়গায় ট্যাপ করা।
এই ডায়েরিতে সে তার জীবনের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো লিখে রাখে।এই ডায়েরির মাঝামাঝি কোন এক জায়গায় সাজিদ আমার সাথে প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটিও লিখে রেখেছে।তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় টি.এস.সি তে।
সে আমার সম্পর্কে লিখে রেখেছে,-
'ভ্যাবলা টাইপের এক ছেলের সাথে সাক্ষাৎ হলো আজ।দেখলেই মনে হবে, জগতের কঠিন বিষয়ের কোনকিছুই সে বুঝেনা।কথা বলার পরে বুঝলাম, এই ছেলে অত্যন্ত বুদ্ধিমান,কিন্তু বোকা।ছেলেটার নাম- আরিফ।'
নিচে তারিখ দেওয়া- '০৫/০৩/০৯
এই ডায়েরিতে নানান বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথাও লিখা আছে।
একবার কানাডার টরেণ্টোতে সাজিদ তার বাবার সাথে একটি অফিসিয়াল ট্যুরে গিয়েছিলো।সেখানে অনেক সেলেব্রিটির সাথে বিলগেটসও আমন্ত্রিত ছিলেন।বিলগেটস সেখানে দশ মিনিটের জন্য বক্তৃতা রেখেছিলেন।সে ঘটনাটি লিখা আছে।
জাফর ইকবালের সাথে সাজিদের একবার বই মেলায় দেখা হয়ে যায়। সেবারের বইমেলায় জাফর স্যারের বই 'একটুখানি বিজ্ঞান' এর দ্বিতীয় কিস্তি 'আরো একটুখানি বিজ্ঞান' প্রকাশিত হয়। সাজিদ জাফর স্যারের বই কিনে বের হওয়ার পথে জাফর স্যারের সাথে তার দেখা হয়ে যায়।সাজিদ স্যারের একটি অটোগ্রাফ নিয়ে, স্যারের কাছে হেসে জানতে চাইলো,- 'স্যার, 'একটুখানি বিজ্ঞান' পাইলাম।এরপর পাইলাম 'আরো একটুখানি বিজ্ঞান'।এটার পরে, 'আরো আরো একটুখানি বিজ্ঞান' কবে পাচ্ছি?'
সেদিন নাকি জাফর স্যার মিষ্টি হেসে বলেছিলেন,- 'পাবে।'
নিজের সাথে ঘটে যাওয়া এরকম অনেক ঘটনাই ঠাঁই পেয়েছে সাজিদের ডায়েরিটাতে।
সাজিদের ডায়েরির আদ্যোপান্ত আমার পড়া ছিলো। কিন্তু, সেমিষ্টার ফাইনাল সামনে চলে আসায় গত বেশ কিছুদিন তার ডায়েরিটা আমার আর পড়া হয়নি।অবশ্য, ডায়েরিটা আমি লুকিয়ে লুকিয়েই পড়ি।
সেদিন থার্ড সেমিষ্টারের শেষ পরীক্ষাটি দিয়ে রুমে আসলাম। এসে দেখি সাজিদ ঘরে নেই।তার টেবিলের উপরে তার ডায়েরিটা পড়ে আছে খোলা অবস্থায়।
ঘর্মাক্ত শরীর। কাঠফাটা রোদের মধ্যে ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে বাসায় ফিরেছি।এই মূহুর্তে বসে ডায়েরিটা উল্টোবো, সে শক্তি বা ইচ্ছে কোনটাই নেই।কিন্তু ডায়েরিটা বন্ধ করতে গিয়ে একটি শিরোনামে আমার চোখ আটকে যায়। আমি সাজিদের টেবিলেই বসে পড়ি। লেখাটির শিরোনাম ছিলো,-
'ভাগ্য বনাম স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি- স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত?'
বেশ লোভনীয় শিরোনাম।শারীরিক ক্লান্তি ভুলেই আমি ঘটনাটির প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম।ঘটনাটি সাজিদের ডায়েরিতে যেভাবে লেখা, ঠিক সেভাবেই আমি পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি-
'কয়েকদিন আগে ক্লাশের থার্ড পিরিয়ডে মফিজুর রহমান স্যার এসে আমাকে দাঁড় করালেন।বললেন,- 'তুমি ভাগ্যে,আই মিন তাকদিরে বিশ্বাস করো?'
আমি আচমকা অবাক হলাম। আসলে এই আলাপগুলো হলো ধর্মীয় আলাপ। মাইক্রোবায়োলজির একজন শিক্ষক যখন ক্লাশে এসে এসব জিজ্ঞেস করেন, তখন খানিকটা বিব্রত বোধ করাই স্বাভাবিক। স্যার আমার উত্তরের আশায় আমার মুখের দিকে চেয়ে আছেন।
আমি বললাম,- 'জ্বি, স্যার।এ্যাজ এ্যা মুসলিম, আমি তাকদিরে বিশ্বাস করি।এটি আমার ঈমানের মূল সাতটি বিষয়ের মধ্যে একটি।'
স্যার বললেন,- 'তুমি কি বিশ্বাস করো যে, মানুষ জীবনে যা যা করবে তার সবকিছুই তার জন্মের অনেক অনেক বছর আগে তার তাকদিরে লিখে দেওয়া হয়েছে?'
- 'জ্বি স্যার'- আমি উত্তর দিলাম।
- 'বলা হয়, স্রষ্টার ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটি ক্ষুদ্র পাতাও নড়েনা, তাই না?'
- 'জ্বি স্যার।'
- 'ধরো, আজ সকালে আমি একজন লোককে খুন করলাম। এটা কি আমার তাকদিরে পূর্ব নির্ধারিত ছিলো না?'
- 'জ্বি, ছিলো।'
- 'আমার তাকদির যখন লেখা হচ্ছিলো, তখন কি আমি জীবিত ছিলাম?'
- 'না, ছিলেন না।'
- 'আমার তাকদির কে লিখেছে? বা, কার নির্দেশে লিখিত হয়েছে?'
- 'স্রষ্টার।'
- 'তাহলে, সোজা এবং সরল লজিক এটাই বলে- 'আজ সকালে যে খুনটি আমি করেছি, সেটি মূলত আমি করি নি।আমি এখানে একটি রোবট মাত্র।আমার ভেতরে একটি প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছেন স্রষ্টা।সেই প্রোগ্রামে লেখা ছিলো যে, আজ সকালে আমি একজন লোককে খুন করবো।সুতরাং, আমি ঠিক তাই-ই করেছি, যা আমার জন্য স্রষ্টা পূর্বে ঠিক করে রেখেছেন।এতে আমার কোন হাত নেই।ডু ইউ এগ্রি,সাজিদ?'
- 'কিছুটা'- আমি উত্তর দিলাম।
স্যার এবার হাসলেন।হেসে বললেন,- 'আমি জানতাম তুমি কিছুটাই একমত হবে,পুরোটা নয়।এখন তুমি আমাকে নিশ্চই যুক্তি দেখিয়ে বলবে,- স্যার, স্রষ্টা আমাদের একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন।আমরা এটা দিয়ে ভালো-মন্দ বিচার করে চলি,রাইট?'
- 'জ্বি স্যার।'
- 'কিন্তু সাজিদ, এটা খুবই লেইম লজিক,ইউ নো? ধরো, আমি তোমার হাতে বাজারের একটি লিষ্ট দিলাম।লিষ্টে যা যা কিনতে হবে, তার সবকিছু লেখা আছে।এখন তুমি বাজার করে ফিরলে।তুমি ঠিক তাই তাই কিনলে যা আমি লিষ্টে লিখে দিয়েছি।এবং তুমি এটা করতে বাধ্য।'
এতটুকু বলে স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন,- 'বুঝতে পারছো?'
আমি বললাম,- 'জ্বি স্যার।'
- 'ভেরি গুড! ধরো, তুমি বাজার করে আসার পর, একজন জিজ্ঞেস করলো, সাজিদ কি কি বাজার করেছো? তখন আমি উত্তর দিলাম,- 'ওর যা যা খেতে মন চেয়েছে, তা-ই তা-ই কিনেছে। বলতো, আমি সত্য বলেছি কিনা?'
আমি বললাম,- 'নাহ, আপনি মিথ্যা বলেছেন।'
স্যার চিৎকার করে বলে উঠলেন,- 'এক্সাক্টলি। ইউ হ্যাভ গট দ্য পয়েণ্ট,মাই ডিয়ার।আমি মিথ্যা বলেছি।আমি লিষ্টে বলেই দিয়েছি তোমাকে কি কি কিনতে হবে।তুমি ঠিক তা-ই তা-ই কিনেছো যা আমি কিনতে বলেছি।যা কিনেছো সব আমার পছন্দের জিনিস। এখন আমি যদি বলি,- 'ওর যা যা খেতে মন চেয়েছে,সে তা-ই তা-ই কিনেছে', তাহলে এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা,না?'
- 'জ্বি,স্যার।'
- 'ঠিক স্রষ্টাও এভাবে মিথ্যা বলেছেন।দুই নাম্বারি করেছেন। তিনি অনেক আগে আমাদের তাকদির লিখে তা আমাদের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন।এখন আমরা সেটাই করি, যা স্রষ্টা সেখানে লিখে রেখেছেন।আবার, এ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে, এই কাজের জন্য কেউ জান্নাতে যাচ্ছে, কেউ জাহান্নামে।কিন্তু কেনো? এখানে মানুষের তো কোন হাত নেই।ম্যানুয়ালটা স্রষ্টার তৈরি। আমরা তো জাষ্ট পারফর্মার।স্ক্রিপ্ট রাইটার তো স্রষ্টা।স্রষ্টা এরজন্য আমাদের কাউকে জান্নাত,কাউকে জাহান্নাম দিতে পারেন না। যুক্তি তাই বলে,ঠিক?'
আমি চুপ করে রইলাম। পুরো ক্লাশে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে তখন।
স্যার বললেন,- 'হ্যাভ ইউ এ্যানি প্রপার লজিক অন দ্যাট টিপিক্যাল কোয়েশ্চান,ডিয়ার?'
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
স্যার মুচকি হাসলেন। মনে হলো- উনি ধরেই নিয়েছেন যে, উনি আমাকে এবার সত্যি সত্যিই কুপোকাত করে দিয়েছেন।বিজয়ীর হাসি।
আমাকে যারা চিনে তারা জানে, আমি কখনো কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় নিই না।আজকে যেহেতু তার ব্যতিক্রম ঘটলো, আমার বন্ধুরা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব চোখ করে তাকালো।তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছিলো, এই সাজিদকে তারা চিনেই না।কোনদিন দেখে নি।
আর, ক্লাশে আমার বিরুদ্ধ মতের যারা আছে, তাদের চেহারা তখন মূহুর্তেই উজ্জ্বল বর্ণ ধারন করলো।তারা হয়তো মনে মনে বলতে লাগলো,- 'মোল্লার দৌঁড় অই মসজিদ পর্যন্তই।হা হা হা'।
আমি মুখ তুলে স্যারের দিকে তাকালাম।মুচকি হাসিটা স্যারের মুখে তখনও বিরাজমান।
আমি বললাম,- 'স্যার, এই ক্লাশে কার সম্পর্কে আপনার কি অভিমত?'
স্যার ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। স্যার জিজ্ঞেস করেছেন কি আর আমি বলছি কি।
স্যার বললেন,- 'বুঝলাম না।'
- 'মানে, আমাদের ক্লাশের কার মেধা কি রকম, সে বিষয়ে আপনার কি ধারনা?'
- 'ভালো ধারনা। ছাত্রদের সম্পর্কে একজন শিক্ষকেরই তো সবচেয়ে ভালো জ্ঞান থাকে।'
আমি বললাম,- 'স্যার, আপনি বলুন তো, এই ক্লাশের কারা কারা ফাষ্ট ক্লাশ আর কারা কারা সেকেন্ড ক্লাশ পাবে?'
স্যার কিছুটা বিস্মিত হলেন। বললেন,- 'আমি তোমাকে অন্য বিষয়ে প্রশ্ন করেছি।তুমি 'আউট অফ কনটেক্সট' এ গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করছো,সাজিদ।'
- 'না স্যার, আমি কনটেক্সটেই আছি। আপনি উত্তর দিন।'
স্যার বললেন,- 'এই ক্লাশ থেকে রায়হান, মমতাজ, ফারহানা, সজীব, ওয়ারেশ, ইফতি, সুমন,জাবেদ এবং তুমি ফাষ্ট ক্লাশ পাবে। আর বাকিরা সেকেন্ড ক্লাশ।'
স্যার যাদের নাম বলেছেন, তারা সবাই ক্লাশের ব্রিলিয়্যাণ্ট ষ্টুডেণ্ট।সুতরাং, স্যারের অনুমান খুব একটা ভুল না।
আমি বললাম,- 'স্যার, আপনি এটা লিখে দিতে পারেন?'
- 'Why not'- স্যার বললেন।
এই বলে তিনি খচখচ করে একটা কাগজের একপাশে যারা ফাষ্ট ক্লাশ পাবে তাদের নাম, অন্যপাশে যারা সেকেন্ড ক্লাশ পাবে,তাদের নাম লিখে আমার হাতে দিলেন।
আমি বললাম,- 'স্যার, ধরে নিলাম যে আপনার ভবিষ্যৎবাণী সম্পূর্ণ সত্য হয়েছে।মানে, আপনি ফাষ্ট ক্লাশ পাবে বলে যাদের নাম লিখেছেন,তারা সবাই ফাষ্ট ক্লাশ পেয়েছে,আর যারা সেকেন্ড ক্লাশ পাবে লিখেছেন, তাদের সবাই সেকেন্ড ক্লাশ পেয়েছে।'
- 'হুম, তো?'
- 'এখন, স্যার বলুন তো, যারা ফাষ্ট ক্লাশ পেয়েছে, আপনি এই কাগজে তাদের নাম লিখেছেন বলেই কি তারা ফাষ্ট ক্লাশ পেয়েছে?'
- 'নাহ তো।'
- 'যারা সেকেন্ড ক্লাশ পেয়েছে, তারা সেকেন্ড ক্লাশ পাবে বলে আপনি এই কাগজে লিখেছেন বলেই কি তারা সেকেন্ড ক্লাশ পেয়েছে?'
স্যার বললেন,- 'একদম না।'
- 'তাহলে মূল ব্যাপারটি কি স্যার?'
স্যার বললেন,- 'মূল ব্যাপার হলো, আমি তোমাদের শিক্ষক।আমি খুব ভালো জানি পড়াশুনায় তোমাদের কে কেমন।আমি খুব ভালো করেই জানি, কার কেমন মেধা। সুতরাং, আমি চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারি কে কেমন রেজাল্ট করবে।'
আমি হাসলাম। বললাম,- 'স্যার, যারা সেকেন্ড ক্লাশ পেয়েছে, তারা যদি আপনাকে দোষ দেয়? যদি বলে, আপনি 'সেকেন্ড ক্লাশ' ক্যাটাগরিতে তাদের নাম লিখেছেন বলেই তারা সেকেন্ড ক্লাশ পেয়েছে?'
স্যার কপালের ভাঁজ লম্বা করে বললেন,- 'ইট উড বি টোট্যালি বুলশিট! আমি কেন এর জন্য দায়ী হবো? এটা তো সম্পূর্ণ তাদের দায়। আমি শুধু তাদের মেধা,যোগ্যতা সম্পর্কে ধারনা রাখি বলেই অগ্রিম বলে দিতে পেরেছি যে কে কেমন রেজাল্ট করবে।'
আমি আবার জোরে জোরে হাসতে লাগলাম। পুরো ক্লাশ আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
আমি থামলাম।বললাম,- 'স্যার, তাকদির তথা ভাগ্যটাও ঠিক এরকম। আপনি যেমন আমাদের মেধা, যোগ্যতা,ক্ষমতা সম্পর্কে ভালো ধারনা রাখেন, স্রষ্টাও তেমনি তার সৃষ্টি সম্পর্কে ধারনা রাখেন।আপনার ধারনা মাঝে মাঝে ভুল হতে পারে, কিন্তু স্রষ্টার ধারনায় কোন ভুল নেই।স্রষ্টা হলেন আলিমুল গায়েব।তিনি ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব জানেন।
আপনি যেরকম আমাদের সম্পর্কে পূর্বানুমান করে লিখে দিয়েছেন যে, আমাদের মধ্যে কারা কারা ফাষ্ট ক্লাশ পাবে, আর কারা সেকেন্ড ক্লাশ।এর মানে কিন্তু এই না যে, আপনি বলেছেন বলে আমাদের কেউ ফাষ্ট ক্লাশ পাচ্ছি, কেউ সেকেন্ড ক্লাশ।
স্রষ্টাও সেরকম পূর্বানুমান করে আমাদের তাকদির লিখে রেখেছেন।তাতে লেখা আছে দুনিয়ায় আমরা কে কি করবো।এর মানেও কিন্তু এই না যে, তিনি লিখে দিয়েছেন বলেই আমরা কাজগুলো করছি।বরং, এর মানে হলো এই- তিনি জানেন যে, আমরা দুনিয়ায় এই এই কাজগুলো করবো।তাই তিনি তা অগ্রিম লিখে রেখেছেন তাকদির হিসেবে।
আমাদের মধ্যে কেউ ফাষ্ট ক্লাশ আর কেউ সেকেন্ড ক্লাশ পাবার জন্য যেমন কোনভাবেই আপনি দায়ী নন, ঠিক সেভাবে, মানুষের মধ্যে কেউ ভালো কাজ করে জান্নাতে, আর কেউ খারাপ কাজ করে জাহান্নামে যাবার জন্যও স্রষ্টা দায়ী নন।স্রষ্টা জানেন যে, আপনি আজ সকালে একজনকে খুন করবেন।তাই তিনি সেটা আগেই আপনার তাকদিরে লিখে রেখেছেন।এটার মানে এই না যে- স্রষ্টা লিখে রেখেছে বলেই আপনি খুনটি করেছেন।এর মানে হলো- স্রষ্টা জানেন যে,আপনি আজ খুনটি করবেন।তাই সেটা অগ্রিম লিখে রেখেছেন আপনার তাকদির হিসেবে।
স্যার, ব্যাপারটা কি এখন পরিষ্কার?
স্যারের চেহারাটা কিছুটা ফ্যাকাশে মনে হলো। তিনি বললেন,- 'হুম।'
এরপর স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন।তারপর বললেন,- 'আমি শুনেছিলাম তুমি ক'দিন আগেও নাস্তিক ছিলে।তুমি আবার আস্তিক হলে কবে?'
আমি হা হা হা করে হাসলাম। বললাম,- 'এই প্রশ্নটা কিন্তু স্যার আউট অফ কনটেক্সট।'
এটা শুনে পুরো ক্লাশ হাসিতে ফেঁটে পড়লো।
পিরিওডের একদম শেষদিকে, স্যার আবার আমাকে দাঁড় করালেন।বললেন,- 'বুঝলাম স্রষ্টা আগে থেকে জানেন বলেই লিখে রেখেছেন।তিনি যেহেতু আগে থেকেই জানেন কে ভালো কাজ করবে আর কে খারাপ কাজ করবে, তাহলে পরীক্ষা নেওয়ার কি দরকার? যারা জান্নাতে যাওয়ার তাদের জান্নাতে, যারা জাহান্নামে যাওয়ার তাদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেই তো হতো,তাই না?'
আমি আবার হাসলাম। আমার হাতে স্যারের লিখে দেওয়া কাগজটি তখনও ধরা ছিলো।আমি সেটা স্যারকে দেখিয়ে বললাম,- 'স্যার, এই কাগজে কারা কারা ফাষ্ট ক্লাশ পাবে, আর কারা কারা সেকেন্ড ক্লাশ পাবে, তাদের নাম লেখা আছে। তাহলে এই কাগজটির ভিত্তিতেই রেজাল্ট দিয়ে দিন।বাড়তি করে পরীক্ষা নিচ্ছেন কেনো?'
স্যার বললেন,- 'পরীক্ষা না নিলে কেউ হয়তো এই বলে অভিযোগ করতে পারে যে,- 'স্যার আমাকে ইচ্ছা করেই সেকেন্ড ক্লাশ দিয়েছে।পরীক্ষা দিলে আমি হয়তো ঠিকই ফাষ্ট ক্লাশ পেতাম।'
আমি বললাম,- 'একদম তাই,স্যার। স্রষ্টাও এইজন্য পরীক্ষা নিচ্ছেন,যাতে কেউ বলতে না পারে- দুনিয়ায় পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে আমি অবশ্যই আজকে জান্নাতে থাকতাম। স্রষ্টা ইচ্ছা করেই আমাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছে।'
ক্লাশের সবাই হাত তালি দিতে শুরু করলো। স্যার বললেন,- 'সাজিদ, আই হ্যাভ এ্যা লাষ্ট কোয়েশ্চান।'
- 'ডেফিনেইটলি, স্যার।'- আমি বললাম।
- 'আচ্ছা, যে মানুষ পুরো জীবনে খারাপ কাজ বেশি করে,সে অন্তত কিছু না কিছু ভালো কাজ তো করে,তাই না?'
- 'জ্বি স্যার।'
- 'তাহলে, এই ভালো কাজগুলোর জন্য হলেও তো তার জান্নাতে যাওয়া দরকার,তাই না?'
আমি বললাম,- 'স্যার, পানি কিভাবে তৈরি হয়?'
স্যার আবার অবাক হলেন। হয়তো বলতে যাচ্ছিলেন যে, এই প্রশ্নটাও আউট অফ কনটেক্সট, কিন্তু কি ভেবে যেন চুপসে গেলেন।বললেন,- 'দুই ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেনের সংমিশ্রণে।'
আমি বললাম,- 'আপনি এক ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেন দিয়ে পানি তৈরি করতে পারবেন?'
- 'কখনোই না।'
- 'ঠিক সেভাবে, এক ভাগ ভালো কাজ আর এক ভাগ মন্দ কাজে জান্নাত পাওয়া যায়না। জান্নাত পেতে হলে হয় তিন ভাগই ভালো কাজ হতে হবে, নতুবা দুই ভাগ ভালো কাজ, এক ভাগ মন্দ কাজ হতে হবে। অর্থাৎ, ভালো কাজের পাল্লা ভারি হওয়া আবশ্যক।'
সেদিন আর কোন প্রশ্ন স্যার আমাকে করেন নি।'
-
এক নিশ্বাঃসে পুরোটা পড়ে ফেললাম।কোথাও একটুও থামিনি। পড়া শেষে যেই মাত্র সাজিদের ডায়েরিটা বন্ধ করতে যাবো, অমনি দেখলাম, পেছন থেকে সাজিদ এসে আমার কান মলে ধরেছে।সে বললো,- 'তুই তো সাংঘাতিক লেভেলের চোর।'
আমি হেসে বললাম,- 'হা হা হা। স্যারকে তো ভালো জব্দ করেছিস ব্যাটা।'
কথাটা সে কানে নিলো বলে মনে হলো না।নিজের সম্পর্কে কোন কমপ্লিমেন্টই সে আমলে নেয় না। গামছায় মুখ মুছতে মুছতে সে খাটের উপর শুয়ে পড়লো।
আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম। বললাম,- 'সাজিদ......'
- 'হু'
- 'একটা কথা বলবো?'
- 'বল।'
- 'জানিস, একসময় যুবকেরা হিমু হতে চাইতো।হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে, মরুভূমিতে গর্ত খুঁড়ে জ্যোৎস্না দেখার স্বপ্ন দেখতো।দেখিস,এমন একদিন আসবে, যেদিন যুবকেরা সাজিদ হতে চাইবে। ঠিক তোর মতো......'
এই বলে আমি সাজিদের দিকে তাকালাম।দেখলাম, ততক্ষণে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। অঘোর ঘুম........
'তাকদির বনাম স্বাধীন ইচ্ছা'- স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত?'/ আরিফ আজাদ
(চতুর্থ পর্ব)

আল্লাহর হুকুম

সারাজীবন আল্লাহর হুকুম মানতে গিয়ে আমরা চিন্তা করি, "লোকে কি বলবে!"

ফাইনালি লোকে বলে, "ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন"

From Arif Faisal Auni bhai's timeline

পুনরুত্থান কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থা!

এক বিকট, কান ফাটানো শব্দ
চোখের পাতায় ধুলোর আস্তরণ
ধুলো মুছতে মুছতে আপনি উঠে বসলেন
নিজেকে সামলে নিয়ে চারপাশে তাকালেন

টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়ে...

ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন

চারপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ

আদিগন্ত বিস্তৃত

.
সবাই দলবেঁধে ছুটছে একই দিকে
আপনিও তাদের সাথে ছোটা শুরু করলেন
কেউ কোন কথা বলছে না
শুধু পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে
সবাই শব্দ লক্ষ্য করে ছুটে চলেছে অবিরাম
আপনার শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে
প্রতি মিনিটে বুকের ভেতরের ভয়টা বেড়েই চলছে।
.
হঠাৎ আবিষ্কার করলেন শুধু মানুষ না
বিভিন্ন জন্তুও ছুটে চলছে…বন্য এবং গৃহপালিত,
হিংস্র ও গর্বিত
আগে হয়তো আপনি এদের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা করতেন
কিন্তু প্রচণ্ড ভয় এখন আপনাকে নড়তে দিচ্ছে না।
চারপাশের মানুষগুলোর উপস্থিতির দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ ছাড়াই
জন্তুগুলো নতমস্তকে, নতদৃষ্টিতে এগিয়ে চলেছে।
.
এক জনসমুদ্রের মাঝে
নগ্ন দেহগুলো একে অপরের সাথে লেপ্টে আছে
সবাই হাসফাঁস করছে, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম,
কারো সময় নেই সৌজন্যতার কিংবা দুঃখ প্রকাশ করার
কারো সময় নেই অন্য কারো দিকে তাকাবার
আজ সবাই নেশাগ্রস্তের ন্যায়,
আতংকে ও উৎকন্ঠায় নিশ্চল...
আজ এক ভারী বোঝা আপনার উপর চেপে বসেছে,
যা বইবার সামর্থ্য আপনার নেই।
.
নতুন এক দলের আগমন ঘটছে
তাদের মতো কোন কিছুই এর আগে দেখেন নি
চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত ওদের অবয়ব বীভৎস, ভয়ংকর!
জ্বীন...
কুৎসিত, অপার্থিব!
বিভিন্ন আকারের
বাকিদের মতোই তারা দাঁড়িয়ে...ভীতসন্ত্রস্ত ও কম্পমান
.
ওদের মাথার ওপর দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন...
একটি তারা খসে পড়ছে
তারপর আরেকটা, তারপর আরও একটা
তীব্র আতঙ্ক নিয়ে আপনি উপলব্ধি করলেন
আকাশ থেকে নক্ষত্ররাজি খুলে পড়ছে!
.
আপনার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে,
স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে
বহু আগেই হয়তো আপনার হৃৎস্পন্দন থেমে যেত।
.
অসংখ্য মানুষগুলো একসাথে আর্তচিৎকার করছে,
কোথাও আর পালাবার রাস্তা নেই,
আজ আর কোন সাহায্যকারী নেই।
.
চির পরিচিত আকাশ আর পৃথিবী আজ অপরিচিত।
শুধুমাত্র আলো বিলিয়ে চলা
মাথার ওপরের চাঁদ আর সূর্যটাই চেনা।
.
যেন যুগ যুগ ধরে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন
সমস্ত শরীর জুড়ে ব্যাথা,
ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আপনি কাতর
এই যন্ত্রণা আপনাকে অবসন্ন, নিস্তেজ করে ফেলতো
যদি সর্বগ্রাসী এ আতংক আপনাকে ঘিরে না রাখতো
এক মূহুর্তের জন্য এ ভয় আপনাকে ছেড়ে যায় নি
আর ক্রমশই তা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
.
আর তারপর
এক নিমেষে
মূহুর্তের মধ্যে
সূর্য আর চাঁদের আলো নিভে গেল।
.
পুরো পৃথিবী গভীর অন্ধকারে ডুবে গেল।
মাথার ওপরের আকাশটাও এখন বদলাতে শুরু করেছে
সবকিছু ছাপিয়ে অসহায়ত্বের অনুভুতি আপনাকে গ্রাস করছে
“হায় ! কখনো যদি এ ঘুম না ভাঙ্গতো!”
ভাবতে না ভাবতেই...
তীব্র গর্জনে পৃথিবী প্রকম্পিত হয়ে উঠলো
.
কিন্তু না, পৃথিবী না
আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে
টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে
আর রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে।
মানুষের আর্তচিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে উঠছে, সবাই ভয়ে উন্মাদ প্রায়...
আকাশের প্রান্তসীমায় দেখা গেল নতুন একশ্রেণীর প্রানী
ফেরেশতা।
বিশালাকার, প্রকান্ড
সকল কল্পনাকে হার মানানো
তারা একে একে জমীনে অবতরণ করলেন ।
প্রবল, রাজকীয়, ভীতিকর, ভয়ঙ্কর
তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাদের রবের প্রশংসায়
.
ভীড়ের মধ্য থেকে
নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে একটি প্রশ্ন ভেসে এল
যা ফেরেশতাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুললো
“তোমাদের মাঝে কি আমাদের রব আছেন?”
.
ত্রস্তস্বরে তারা জবাব দিলেন "মহিমান্বিত আমাদের রব!"
"না, তিনি আমাদের মাঝে নেই।
তবে...
তিনি আসছেন..."
.
.
সেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে।
সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে ও বিক্ষিপ্ত হবে।
এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে ও আট জন ফেরেশতা আপনার পালনকর্তার আরশকে তাদের উর্ধ্বে বহন করবে।
সেদিন তোমাদেরকে উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোন কিছু গোপন থাকবে না।
[সূরা আল-হাক্বা, ১৫-১৮]
.

‪#‎KnowYourDeen‬